উৎস মানুষ পত্রিকার পথচলা শুরু ১৯৮০ সালের জানুয়ারী মাস থেকে। সত্তর দশকের রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে - এক সুষ্ঠ, সুন্দর সমাজ গড়তে, মানুষের সার্বিক জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাতে, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও অকপট অবাধ প্রশ্ন করার অভ্যেস গড়ে তুলতে এবং চিন্তার জগতে মানুষের পরনির্ভরতা কাটাতে উৎস মানুষ পত্রিকা অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছিল। প্রথম তিন দশক অক্লান্ত পরিশ্রমে ও কিছু নিঃস্বার্থ বন্ধুমন্ডলীর সহায়তায় পত্রিকার প্রাণ-স্পন্দনকে সজীব রেখেছিলেন প্রয়াত অশোক বন্দ্যোপাধ্যায়। ডিজিটাল আগ্রাসনের ধুম্রজালে প্রদীপের ম্লান শিক্ষার মতো বছরে চারটি সংখ্যা এখনও প্রকাশিত হয়ে চলেছে পাঠকদের আন্তরিক সহযোগিতায়। উৎস মানুষ প্রকাশনার কিছু বই বিগত চল্লিশ বছর ধরে সাধারণ পাঠকের কাছে সমাদৃত, যা আমাদের উৎসাহিত করে। তবে অন্তিম লক্ষ্য এখনো আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়, কোথায় উৎস মানুষের কাজ পরিপূর্ণ চেহারায় একটা মতাদর্শগত রূপ পাবে তাও অজানা, তাই প্রদীপের আলোটুকুকে ধরে রাখতে নতুন বন্ধুদের সযোগিতা চাই।
কোন দলীয় রাজনীতি-র মুখপাত্র না হলেও ব্যাপকতর অর্থে উৎস মানুষের কাজ এক অন্তৰ্নিহিত রাজনৈতিক তাৎপর্য বহন করে। আমরা বিশ্বাস করি সাধারণ মানুষের জীবনযাপনে যুক্তিবাদের চর্চা ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্ব অপিরিসীম, যা রাজনীতি বাদ দিয়ে হয় না। এক কথায় বলা চলে উৎস মানুষের কাজ বৃহত্তর রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পরিপূরক। আমরা মনে করি বিজ্ঞানচেতনা গড়ে তোলা না গেলে সাধারণ মানুষের যাবতীয় উন্নয়নের সংগ্রাম অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সামাজিক অবক্ষয়ের এই আবহে যে-কোন অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন মানুষের আত্মজ্ঞানের উন্মেষে উৎস মানুষ পাশে দাঁড়াতে সচেষ্ট থাকে। এলিট পত্রিকার তকমা যাতে উৎস মানুষের ওপর না পড়ে তা নিয়ে আমরা সদা-সতর্ক থাকি। উচ্চাশা বলতে - উৎস মানুষ সবার কাছে একটি পারিবারিক পত্রিকা হয়ে উঠুক। ব্যবসা-সর্বস্ব পত্রিকার ভিড় ঠেলে উৎস মানুষ তার ক্ষুদ্র শক্তি নিয়ে দৃঢ় প্রত্যয়ে সুস্থতার সামাজিক বাতাবরণ তৈরীতে সাহায্য করবে এই আশা রাখি।
(সময়কাল ১৯৮০-১৯৮৯)
নিজের চোখে দেখার চাইতে অন্যের চোখ দিয়ে নিজেকে জানা-বোঝার পদ্ধতি, পত্রিকার মূল্যায়ন বা পর্যালোচনার ক্ষেত্রে, অনেক বেশি কার্যকরী বলে আমরা মনে করি। বৃহৎ পাঠকসাধারণের এক ক্ষুদ্রতম অংশের মতামত হলেও এগুলি সকলেরই ভাববার বিষয়। নিছক প্রশংসাবাক্য আর সাধুবাদগুলি নয় মতামতের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলি উদ্ধৃত করা হলো এখানে।
ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়
বাবাজি-মাতাজির শিষ্যসংখ্যা ....... যথেষ্ট হওয়া সত্ত্বেও ধর্মের অভ্যুথান ঘটেছে। এই সব নিয়ে চিন্তা ভাবনার সময় এসেছে। এ নিয়ে লেখা আমরা উৎস মানুষ-এ প্রত্যাশা করি। আবার আমার ভয়ের কথা উল্লেখ করে লেখা শেষ করি। যুক্তি ও বিজ্ঞানকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে, ধর্মধ্বজীদের মহিমা খর্ব করতে গিয়ে যুক্তিবাদীরা যেন নিজের 'গুরু' না হয়ে ওঠেন।
পীযূষকান্তি সরকার
.....আত্মশক্তি ছাড়া মানুষের আর কোন আশ্রয় নেই। যুক্তিবুদ্ধি ছাড়া কোন সহায় নেই। এই দুটো সহজ সত্য বারে বারে বলে চলতে হবে। তথ্য দিয়ে প্রমাণ করতে হবে। ....... যুক্তিবাদী মানুষের জীবন-যাত্রা আচার আচরণ কেমন হওয়া উচিত তার দায়-দায়িত্ব ব্যক্তি-মানুষের হাতে ছেড়ে দিলে চলবে না। ব্যক্তির অভিজ্ঞতা, ধ্যানধারণা সীমাবদ্ধ হতে বাধ্য, হঠাৎ কোন জটিল পরিস্থিতি দেখা দিলে লোকে তাই দিশাহারা হয়ে পড়েন। নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলে অনেক সময় আমরা একটা কাজ-চালানো সিদ্ধান্তে আসার চেষ্টা করি। সর্বদা তাতে সুবিধে হয় না। চাই বিকল্প জীবন দর্শন। বিজ্ঞান চেতনার পরিপূরক হিসাবে তার কথাও উৎস মানুষ-এ লেখা দরকার।
রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য
উৎস মানুষ আর একটু সাহস দেখাতে পারে। সমাজ প্রগতির পথে ধর্মের অচলায়তন যে দুর্লঙ্ঘ্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে আর একটু তীক্ষ্ণদৃষ্টি নিবদ্ধ করা যায়, সামাজিক সমস্যাগুলির রাজনৈতিক উপাদান স্পষ্ট বিশ্লেষণ ও প্রকাশের অপেক্ষা রাখে। গণ-বিজ্ঞানে বিষয়গুলির রাজনৈতিক তাৎপর্য ও সমাধানের দিক নির্দেশ বহুলাংশে অনুপস্থিত। নারী মুক্তির সমস্যাগুলির দিকে আর একটু নজর দেওয়া যেতে পারে। বিজ্ঞানমনস্কতার প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার ভূমিকা কি ? বিকল্প ব্যবস্থার রূপরেখা কেমন হতে পারে --- বিচরণের দাবি রাখে এই রকম কিছু কিছু ক্ষেত্র আছে।
সুজিত কুমার দাশ
আমার সোনার বাংলার সাংস্কৃতিক ভাণ্ডারে তার [বুদ্ধসম্মতির] উপকরণ সংগ্রহের কাজও সত্যিই তেমন কঠিন নয়। কেননা অনেকেই ইতিপূর্বে রুখে দাঁড়িয়েছেন এবং যাঁরা রুখে দাঁড়িয়েছেন তাঁদের প্রতিভাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে যাওয়া নেহাতই নির্বোধের ব্যাপার হবে। ...... আধুনিক যুগের, এমনকি অতি সম্প্রতিকাল পর্যন্ত প্রতিরোধের প্রতিজ্ঞা। এই প্রতিরোধের প্রতিজ্ঞার উদ্দেশ্য একটাই। মানুষ করজোড়ে নতমস্তকে কুঁজো হয়ে থাকবে না। মাথা তুলে দাঁড়াবে। এবং তার জন্যে একটা প্রধান প্রয়োজন মানুষের চেতনায় রদবদলের আয়োজন। এই চেষ্টা আজকের দিনে 'উৎস মানুষ'-এর বন্ধুরা করে চলেছেন এবং তারই প্রকরণ (টেকনিক) হিসেবে পাঠকদের প্রতি সংখ্যায় মনে করিয়ে দিচ্ছেন -- আমার এই সোনার বাংলায় সুস্থ্য ঐতিহ্য বলতে কয়েক শতাব্দী ধরে এই প্রয়াসই।
দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
মনকে চোখ ঠারা আর ভাবের ঘরে চুরি করা অনেকটা আমাদের যেন স্বভাবসিদ্ধ হয়ে পড়েছে। তাই 'বামপন্থায়' এগিয়ে আছি ভেবে যতই সস্তা আত্মপ্রসাদ অনুভব করি না, মনির মুক্তির দিক থেকে বাঁধা অবস্থাতেই পড়ে আছি। 'উৎস মানুষ' মুক্তমতি সমাজ নির্মাণে যোগ্য কর্মকার যেন হতে পারে। বহুজন সমবায়ে যথাবিহিত সংস্থা গঠনও এরা করতে পারবেন আশা করতে ক্ষতি কি ?
হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়
অশিক্ষিত, অজ্ঞ, সংস্কারাদ্ধ সাধারণ মানুষের মধ্যে সে [উৎস মানুষ] একদশক ধরে যুক্তি ও চেতনার বীজ বুনে চলেছে। শিক্ষিত দাম্ভিক সর্বজ্ঞ মানুষদের বিরুদ্ধেও তাদের লড়াইয়ে নামতে হবে। নামতে হবে বিভ্রান্ত তারকনাথের চেলাদের স্বৈর অভিযানের বিরুদ্ধে, তারাপীঠ ও কেঁদুলির গঞ্জিকাসেবী মাদকাসক্ত শহুরে যুবাদের উশৃঙ্খলতার বিরুদ্ধে, বড় বড় ধর্মীয় মেলায় লৌকিক গুরুদের শোষণের বিরুদ্ধে। সমমনা মানুষরা তাদের সঙ্গে পরের দশকেও থাকবেন -- ভরসা করি।
অজানা চৌধুরী
উৎস মানুষ শুধু সাক্ষর নয় নিরক্ষর জনতার মধ্যে পৌঁছে দেয় যেন........তবেই মনে হয় পত্রিকাটির বিজ্ঞানমুখী গণ-সংযোগ সার্থক হবে।
কিছু কিছু সহজ ভাষায় লেখা হোক উৎস মানুষ-এর পাতায়। না হলে পাঠকেরা প্রদীপের তলায় অন্ধকারটাকেই জানলেন-----আলোর দেখা মিললো না। ..... বিজ্ঞানের কথা সরল করে বোঝাতে হবে। সরল মানে কিন্তু জোলো নয়। বৈজ্ঞানিক তত্ব থেকে সরে না গিয়েও কথাকে সহজ করা যায়, যদি আন্তরিক চেষ্টা থাকে, এমন 'বেগনি-পারের আলো'-র দেখা পেতে চাই উৎস মানুষের পাতায়।
The journey of Utsa Manush began in January 1980. Against the backdrop of the political and social turbulence of the 1970s, the magazine pledged itself to the task of building a just and humane society, improving the overall quality of people’s lives, fostering a scientific temper and the habit of asking frank and uninhibited questions, and freeing people from intellectual dependence in matters of thought.
For the first three decades, through tireless effort and with the support of a few selfless friends, the late Asok Bandyopadhyay kept the life-force of the magazine vibrantly alive. Today, amid the smoky haze of digital onslaught—like the dim yet steadfast flame of a lamp—four issues a year continue to be published with the heartfelt support of readers. Over the past forty years, several books published by Utsa Manush have been warmly received by general readers, and they continue to encourage us. Yet our ultimate destination remains unclear; where and how the work of Utsa Manush will assume a fully realized ideological form is still uncertain. Therefore, to keep this small flame burning, we seek the support of new friends.
Though not the mouthpiece of any political party, the work of Utsa Manush carries an inherent political significance in a broader sense. We believe that the practice of rationalism and the cultivation of a scientific temper in the everyday lives of ordinary people are of immense importance—and this cannot be achieved by entirely setting politics aside. In short, the work of Utsa Manush complements a broader political, social, and cultural movement. We believe that without nurturing scientific consciousness, the struggle for the comprehensive advancement of ordinary people remains incomplete. In this climate of social decay, Utsa Manush seeks to stand beside every literate person in awakening self-awareness. We remain constantly vigilant that the label of an “elite” magazine does not attach itself to Utsa Manush. Our aspiration is for Utsa Manush to become a family magazine for all. Amid the crowd of profit-driven publications, we hope that Utsa Manush, with its modest strength and firm conviction, will help foster a healthy social environment.